খুব সুন্দরভাবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা গত বছরের আগের বছর একটা পোস্টার ছাপিয়েছে। সেই পোস্টারটি আমি প্রায়ই রোগীদের দেখাই, সেমিনারেও দেখাই। এত চমৎকার পোস্টার। মাথার চুল থেকে পায়ের নখ, একটা লোকের সম্পূর্ণ দেহ। সেখানে এমন কোনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নেই যেখানে তামাকের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না। এরপর চোখের ছানি পড়া। মুখের ভেতর মুখের ক্যানসার। গলায় গলার ক্যানসার। কানের শ্রবণশক্তি হ্রাস। এরপর বুকের একদিকে হৃৎপিণ্ডের সমস্যা, এরপর হলো ফুসফুসে ক্যানসার। তারপর পুরুষের যৌনশক্তি হ্রাস। মেয়েদের অকালে গর্ভপাত। এরপর চর্মরোগ। সবশেষে পায়ের নখে পচনশীল রোগ গ্যাংরিন। এর জন্য পা কেটে ফেলতে হয়।
আমাদের বারডেম হাসপাতালে অসংখ্য ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগী, যাঁরা ধূমপায়ী, তাঁরা আসেন পায়ের বিভিন্ন ধরনের ঘা নিয়ে। পরীক্ষা করে দেখা যায় তাদের গ্যাংরিন হয়েছে। আপনারা তো জানেন এটি একটি পচনশীল রোগ। সুস্থ পা পর্যন্ত কেটে ফেলতে হয় যাতে পচনশীলতাটা না বাড়তে পারে। এ জন্য পা কেটে ফেলতে হয়। পঙ্গু হয়ে যাচ্ছে। অসংখ্য পঙ্গু রোগী আমাদের হাসপাতালে আছে। এগুলো প্রতিটি রোগই তামাক এবং ধূমপানের কারণে হয়। এরপরও মানুষ ধূমপান করছে। এরপরও মানুষ তামাক গ্রহণ করছে। শরীরে প্রতিটি অঙ্গকে আক্রান্ত করে এই পদার্থ। এরপরও মানুষ করছে। একমাত্র তামাক, যার মধ্যে সাত হাজার রাসায়নিক পদার্থ আছে। এগুলো সবই বিষাক্ত।
আপনি মনে করেন রাস্তায় যে গাড়ির ধোঁয়া, কার্বন মনো-অক্সাইড সেটাও সিগারেটে আছে। আমরা যে মশা-মাছি মারি অ্যারোসল দিয়ে, সেটাও তামাকের মধ্যে আছে। আমরা পানি খাই না আর্সেনিকের ভয়ে। সেটাও তামাকের মধ্যে আছে। সবচেয়ে মারাত্মক যেটা সেটা হলো নিকোটিন। নিকোটিন হলো কঠিন নেশার মতো। এখন বিজ্ঞানীরা বলছেন, নিকোটিন হেরোইন ও কোকেনের চেয়ে বেশি শক্তিশালী। এ জন্য যারা সিগারেট একবার ধরে তারা ছাড়তে পারে না। নেশায় আসক্ত করার শক্তিটা তার অনেক বেশি।
একটি গল্প আছে। একজন বলছে, ‘সিগারেট ছাড়া অনেক সহজ’। অন্যজন বলছে, ‘কেন’? উনি বলছেন, ‘আমি অনেকবার ছেড়েছি’। মানে একবার ধরলে সহজে ছাড়া যায় না। বারবার ধরতে হয়।
আইনের প্রয়োগটা কিছুদিন আগেও ছিল না। কিন্তু বর্তমান সরকারের ক্ষেত্রে এখন কিন্তু টোবাকো কন্ট্রোল টাস্কফোর্স করা হয়েছে, ভেজালবিরোধী অভিযানের মতো। তারা কিন্তু শহরে বিভিন্ন জায়গায় যাচ্ছে। বিশেষ করে মফস্বলে। আমাদের কাছে প্রতিবেদন আসে প্রতিনিয়ত। আমি টোবাকো কন্ট্রোল টাস্কফোর্সের সদস্য। এরা বিভিন্ন মফস্বল শহরে ডিসির অধীনে বিভিন্ন জায়গাগুলোতে যাচ্ছে। যারা পাবলিক প্লেসে (লোকস্থানে) ধূমপান করে, অর্থাৎ শপিং মল, বাসস্টেশন, রেলস্টেশন, স্কুল, কলেজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রেস্টুরেন্ট, আদালত ভবন-সব জায়গায় যারা ধূমপান করছে তাদের কিন্তু শাস্তি দেওয়া হচ্ছে। আগে ছিল ৫০ টাকা, এখন ৩০০ টাকা জরিমানা।
আর তামাক কোম্পানি যদি কোনো বিলবোর্ড, সাইনবোর্ড, কোনো প্যাকেটে যদি বিজ্ঞাপন দেয় তাদেরও তিন হাজার টাকা জরিমানা। এইগুলো এখন কিন্তু বলবৎ হয়েছে। এখন আপনি তো কোনো ইলেকট্রনিক বা প্রিন্ট মিডিয়ায় তামাকের বিজ্ঞাপন দেখছেন না। এটি আমাদের একটি বিশাল সাফল্য যে আমরা আন্দোলনের কারণে করতে পেরেছি। তামাকের এখন কোনো বিজ্ঞাপন কিন্তু আপনি দেখবেন না। এখন কোনো স্পনসরও করা যায় না। তামাক কোম্পানির কোনো ধরনের খেলা বা ব্যান্ড শো বা কনসার্ট এখন স্পনসর করতে পারবে না। এটা আইনত নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সুতরাং এগুলো সবই কিন্তু আমাদের সাফল্য।

0 মন্তব্যসমূহ